রোগীর মানসিক স্বাস্থ্য ও যত্ন: কেন উপদেশ নয়, ‘পাশে থাকা’ই আসল চিকিৎসা?

অসুখ জিনিসটা বড় খতরনাক। এ যেন দুনিয়ার মাঝেই আস্ত এক ভিনদেশি মুল্লুক। ভিসা-পাসপোর্ট লাগে না বটে, কিন্তু একবার সে দেশ থেকে ডাক এলে যমের অরুচিও সুড়সুড় করে সেখানে হাজিরা দিতে বাধ্য। হাসপাতালের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে এই মুল্লুকের হালহকিকত বেশ মালুম হয়।

চারদিকে গিজগিজ করছে মানুষ। ডাক্তার-বদ্যি, নার্স, আত্মীয়স্বজনের দৌড়ঝাঁপ। লাল-নীল বাতি জ্বলছে, আর অবিরাম ‘বীপ বীপ’ শব্দে কান ঝালাপালা। এত শোরগোল, এত আড়ম্বরের মাঝেও বিছানায় শুয়ে থাকা ওই মানুষটার চোখের দিকে তাকালে তাজ্জব হতে হয়। কী এক অদ্ভুত শূন্যতা সেখানে! মনে হয়, আমরা সবাই এই চেনা পৃথিবীতেই বহাল তবিয়তে আছি, আর ওই বেচারা একা নির্বাসিত হয়েছে ভিনগ্রহের কোনো এক খাঁ খাঁ দ্বীপে।

বিপদের সময় বানরের বুদ্ধি

কোন্‌ এক কেতাবে যেন পড়েছিলাম, জঙ্গলে বিপদের গন্ধ পেলে বাঁদরের পাল কী করে। তারা নাকি সব একসঙ্গে জড়ো হয়ে একে অপরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরে। তাতে কি বাঘ পালায়? আলবত না! বাঘের পেটে যাওয়ার ভয় ষোলো আনাই থাকে, কিন্তু ওই যে গায়ে গা লাগিয়ে বসা—ওতেই বুকের ধুকপুকানি কিছুটা শান্ত হয়। একাকীত্বের দাঁত-নখ ভোঁতা হয়ে যায়।

তা মশাই, আমরা যতই স্যুট-কোট পরি আর ল্যাপটপ টিপি না কেন, আমাদের ভেতরেও ওই আদিম জীবটা ঠিকই ঘাপটি মেরে আছে। বিপদের দিনে, অসুখের বিছানায় আমাদেরও বড্ড দরকার হয় কেউ একজন অন্তত গা ঘেঁষে পাশে বসে থাকুক। কিন্তু মুশকিল কী জানেন? এই আধুনিক সভ্যতা আমাদের এমন যন্ত্র বানিয়েছে যে, এই অতি সোজা আর স্বাভাবিক জিনিসটাই আমরা বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছি!

সবজান্তা ‘ফিক্সার’ হওয়ার এই যে রেওয়াজ

কারো ক্যানসার হলো, হার্ট ফেইলিওর হলো, বা অন্য কোনো বড় বেমার ধরল। খবরটা শোনা মাত্রই আমরা রাতারাতি একেকজন সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি কিম্বা ‘ফিক্সার’ বনে যাই। মেরামতির কন্ট্রাক্ট যেন আমাদেরই!
“আরে ভাই, মাদ্রাজ চলে যা!”
“অমুক ডাক্তারের কাছে যা, জাদু করে দেবে।”
“এই ডায়েটটা ফলো কর, আর হ্যাঁ, পজিটিভ থিঙ্কিং কর—সব ঠিক হয়ে যাবে!”

উপদেশ, ইউটিউবের লিঙ্ক, বড় বড় আর্টিকেল—একদম বস্তাভরে সাপ্লাই দিতে থাকি আমরা। সত্যি কথাটা কী জানেন? আমরা বড় অসহায়। কিছু পরিস্থিতি যে আমাদের কন্ট্রোলের বাইরে, সেখানে আমাদের যে স্রেফ বোকার মতো পাশে বসে থাকা ছাড়া আর কিচ্ছু করার নেই—এই চরম সত্যটা মেনে নিতে আমাদের ইগোতে লাগে।

এদিকে গবেষকরা গলা ফাটিয়ে বলছেন, এই একাকীত্ব জিনিসটা নিজেই নাকি এক মস্ত ব্যাধি। একা একা বিছানায় পড়ে থাকলে প্রেশার, সুগার, হার্টের অসুখ হুড়মুড় করে বাড়ে। সোজা কথায়—আপনি রোগীকে গন্ডা গন্ডা দামি ওষুধ খাওয়াচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু কোন মানুষ তার সাথে-পাচে নেই! এ তো মশাই অর্ধেক চিকিৎসা!

রোগীর আসলে কী চাই?

রোগীর তখন সওয়াল একটাই— “আমার পাশে কে থাকবে?”
ডাক্তারের অভাব নেই, ওষুধেরও কমতি নেই। কিন্তু মাঝরাতে যখন বুকের ভেতরটা অজানা ভয়ে ছমছম করে ওঠে, রিপোর্টের খামের দিকে তাকিয়ে যখন হাত কাঁপে, কেমোর পর যখন মনে হয় মরে গেলেই ভালো হতো—তখন তো আর প্রেসক্রিপশনের পাতা চিবিয়ে শান্তি মেলে না!

ঠিক তখনই দরকার হয় ‘উপস্থিতি’ নামক মহৌষধের। কেউ একজন চুপটি করে পাশে বসে আছে। ঘনঘন ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে না। পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফেসবুক ঘাঁটছে না। রোগীর একই ঘ্যানঘ্যানানি দশবার শুনেও বিরক্ত হচ্ছে না।
মনোবিজ্ঞানের কেতাবি ভাষায় একে বলে ‘Social Support’, কিন্তু আসলে এটা হলো একটা নিঃশব্দ বার্তা— “ভয় কী হে? তুমি একা নও, আমি তো আছি।”

ইতিহাস আর ধর্মের পাতা উল্টালে কী দেখি?

সেকালের মানুষেরা এই গূঢ় তত্ত্বটা ভালোই বুঝত। গ্রিকদের কথাই ধরুন না; অ্যাসক্লেপিয়াসের মন্দিরে রোগীদের শুধু জড়িবুটি গিলিয়েই খালাস পেত না তারা। সেখানে ছিল ‘Healing Presence’—পাশে বসে থাকার মানুষ, সুন্দর গল্প, নরম সুর আর স্নিগ্ধ আলো। ওরা ঠিক জানত, শুধু শরীরের মেকানিকগিরি করলেই হয় না, মনটাকেও একটু আদর-যত্ন করতে হয়।

আমাদের ইসলামি ঐতিহ্যে তো অসুস্থ মানুষকে দেখতে যাওয়াটা রীতিমতো ইবাদত। নবীজি (সা.) নিজে রোগীর শিয়রে বসতেন, কপালে হাত রাখতেন, নরম গলায় দোয়া পড়তেন।
হাদিসে কুদসির সেই বিখ্যাত বর্ণনাটা মনে আছে? রোজ হাশরের দিন খোদাতাআলা বান্দাকে বলবেন,
“আমি অসুস্থ ছিলাম, তুমি আমাকে দেখতে আসোনি।”
বান্দা তো তাজ্জব! “হে পরওয়ারদিগার, আপনি তো রাব্বুল আলামিন, আপনাকে আমি কীভাবে দেখতে যাব?”
জবাব আসবে, “আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল। তুমি যদি তাকে দেখতে যেতে, তবে সেখানে আমাকেই পেতে।”

ভাবুন দেখি! রোগীর পাশে বসাটা কেবল লৌকিকতা বা ভদ্রতা নয়। এ এক খাস আধ্যাত্মিক ব্যাপার। রোগীর বিছানার পাশে বসে আপনি আসলে নিজের আত্মাকেও একটু ঘষেমেজে সাফ করে আসেন। 

ক্যানসার ওয়ার্ডের এক চিলতে ছবি

ওয়ার্ডে ডিউটি করার সুবাদে একটা দৃশ্য আমি রোজ দেখি।
কিছু রোগীর বিছানার পাশে সবসময় জটলা। কেউ ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে দিচ্ছে, কেউ মাথায় হাত বোলাচ্ছে, কেউ বা স্রেফ চুপ করে বসে আছে।
আর কিছু বিছানা আছে, খাতায়-কলমে ভিআইপি, কিন্তু রোগীর পাশে কাকপক্ষীও নেই। আত্মীয়রা আসে, ফাইলের রিপোর্ট দেখে, ডাক্তারের সঙ্গে দুটো ডাক্তারি কথা বলে আবার হাওয়া হয়ে যায়। রাতের বেলা সেখানে কেবল মেশিনের যান্ত্রিক শব্দ।

এই দুই রোগীর চোখের চাহনিতে আসমান-জমিন ফারাক মশাই! একজনের চোখে ভয় আছে ঠিকই, কিন্তু আপন মানুষ পাশে আছে বলে সে ভয়ের মাঝেও হাসতে পারে। আরেকজনের চোখে ভয়টা যেন জমাট বেঁধে আস্ত পাথর হয়ে গেছে। চিকিৎসা দুজনেরই এক, কিন্তু মানসিক দূরত্বটা যোজন যোজন।

“কী যে বলব!”—এই ভয়ের ভূত নামান

অনেকেই মিনমিন করে বলেন, “আহা, দেখতে তো যেতে চাই, কিন্তু গিয়ে কী যে বলব, ভেবেই পাই না!”
বড় অদ্ভুত কথা! আপনাকে কে বলেছে ওখানে গিয়ে প্লেটো বা অ্যারিস্টটল কপচাতে? নতুন মেডিকেল জার্নাল মুখস্থ করে যাওয়ারও তো দরকার নেই।
স্রেফ গিয়ে বলুন, “কী খবর হে? আজ একটু ভালো তো?”
অথবা কিচ্ছু বলার দরকার নেই। শুধু পাশে গিয়ে বসুন। আপনার ওই বসাটাই একটা মস্ত বড় উত্তর। মনটা খালি রেখে রোগীর দুটো কথা শোনার মতো একটা কান—এর চেয়ে বড় উপহার ওই মুহূর্তে আর কিছু হয় না।

তা, আপনি কী করবেন?

খুব কাজের কথা বলি শুনুন:
১. এক্ষুনি ফোনটা হাতে নিন। যে অসুস্থ মানুষটার কথা অনেকদিন ধরে ভাবছেন, তাকে একটা ছোট্ট মেসেজ ঠুকে দিন— “তোমার কথা খুব মনে পড়ছে। একবার আসব নাকি দেখতে?”
২. হাসপাতালে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে ডিউটি দিতে হবে না। ছোট, কিন্তু আন্তরিক একটা ভিজিট জাদুর মতো কাজ করে।
৩. “অমুক ডাক্তার দেখা, তমুক ওষুধ খা”—এই পাড়াতুতো ডাক্তারি ফলানোর আগে একটু থামুন। জিজ্ঞেস করুন, “তুমি এখন কী নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় আছ?”
৪. দয়া করে নিজের হরর স্টোরি শোনাতে যাবেন না। “আরে আমার এক চাচা তো ক্যানসারে ভুগে এমন কষ্ট পেলো না…”—এসব বলে রোগীর বুকে আর বাঁশ ডলবেন না।

শেষ কথা: উপস্থিতি একটা ওষুধ

ডাক্তার ওষুধ দেবেন, সার্জন ছুরি চালাবেন—ওটাই তাদের কাজ। কিন্তু আপনার কাজটা ভিন্ন। আপনি হলেন সেই মানুষ, যে কি না রোগীর একাকীত্বের বোঝাটা নিজের কাঁধে একটুখানি তুলে নেয়।

এই কাজের কোনো মেডিকেল রিপোর্ট হয় না, ল্যাব টেস্টেও এর ভ্যালু ধরা পড়ে না। কিন্তু রোগীর বুকের ভেতর কোথাও চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে যায়— “না, আমি একা ছিলাম না।”
খুব সম্ভবত, ওপরওয়ালার হিসাবের খাতাতেও এই লাইনটা লাল কালিতে দাগিয়ে রাখা হয়।

আজ রাতেই একবার ভাবুন তো, আপনার চেনাজানা দুনিয়ায় এমন কে আছেন, যে একা একা অসুখের সঙ্গে কুস্তি লড়ছে? একবার গিয়ে শুধু পাঁচটা মিনিট বসে আসুন না! কে বলতে পারে, আপনার ওই পাঁচ মিনিটের উপস্থিতিই হয়তো তার কাছে সঞ্জীবনী সুধা, যার জোরে সে মনে মনে বলবে— “যাক, আমি তাহলে এখনো কারো মানুষ।”

Share the Post:

Related Posts

মুহাম্মদ বিন কাসিম: এক তরুণ সেনানায়কের সিন্ধু অভিযানের গল্প

উপমহাদেশে ইসলামের ইতিহাস বলতে গেলেই আমরা চট করে আমাদের মাথায় আসে দিল্লি সালতানাত, মোগল, বাবর–আকবরের কাহিনী। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এই বিশাল গল্পের প্রথম পাতা তো সেখানে নয়। প্রথম পাতার নায়ক এক কিশোর–যুবক আরব সেনানায়ক—মুহাম্মদ বিন কাসিম। তার জীবন কিন্তু

Read More

জ্ঞানের পিরামিড: তথ্যের জঞ্জাল পেরিয়ে সত্যের সন্ধানে

আজকের তরুণ প্রজন্ম একটা খুব সূক্ষ কিন্তু গভীর সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। তা হচ্ছে চারপাশে ছড়িয়ে থাকা তথ্য, আসলে বলতে গেলে অতিরিক্ত তথ্য।  তারা তথ্যের অভাবে ভুগছে না, বরং অতিরিক্ত তথ্যের মাঝেও দিশাহীনতায় ভুগছে। দিনভর ইনস্টা, টুইটার, ইউটিউব, শর্ট ভিডিও,

Read More