উপমহাদেশে ইসলামের ইতিহাস বলতে গেলেই আমরা চট করে আমাদের মাথায় আসে দিল্লি সালতানাত, মোগল, বাবর–আকবরের কাহিনী। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এই বিশাল গল্পের প্রথম পাতা তো সেখানে নয়। প্রথম পাতার নায়ক এক কিশোর–যুবক আরব সেনানায়ক—মুহাম্মদ বিন কাসিম।
তার জীবন কিন্তু খুব বেশী দীর্ঘ ছিল না। তার শাসনও তিন–চার বছরের বেশি নয়। তবু এই অল্প সময়েই তিনি সিন্ধু থেকে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এমন একটা বাঁক এনে দেন, যা আজও আমাদের পাঠ্যবই আর রাজনীতির পাতায় ঘুরে বেড়ায়।
সময়টা কেমন ছিল?
অষ্টম শতকের শুরু। উমাইয়া খেলাফত তখন পশ্চিমে স্পেন থেকে পূর্বে সিন্ধু সীমান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। আরব বণিকেরা বহুদিন ধরেই ভারতীয় উপকূলে আসা–যাওয়া করছেন। সিন্ধু তাদের কাছে নতুন আবিষ্কার নয়, বরং পুরনো পরিচিত মুখ।
রাজা দাহিরের রাজত্বে সিন্ধু বাইরে থেকে দেখলে খুবই সুন্দর একটা ছবি। নদী আছে, সমৃদ্ধ বন্দর আছে, বাণিজ্যের পথে পণ্যভরা জাহাজ আসা–যাওয়া করছে। কিন্তু ভেতরের গল্পটা এতটা পরিচ্ছন্ন ছিল না—রাজনৈতিক অবস্থা দুর্বল, রাজ্যের বৌদ্ধ জনসংখ্যা অসন্তুষ্ট, স্থানীয় প্রধানরা স্বাধীনভাবে নিজেদের মত নিয়ন্ত্রন চালায়, আর রাজা দূর থেকে শুধু তাকিয়ে শাসন করতেন—কাজের কাজ কিছুই করতেন না।
এই আলগা শাসনেরই ফল ছিল সেই জলদস্যু ঘটনা। আরব বিধবা আর এতিম শিশুদের বহনকারী জাহাজ সিন্ধুর সমুদ্রবন্দর দেবল এর উপকন্ঠে লুঠ হল, বন্দি হল মানুষ, লুঠ হল মালপত্র। ইরাক–মাকরানের শক্তিশালী গভর্নর হজ্জাজ বিন ইউসুফ বারবার চিঠি পাঠালেন সিন্ধুর রাজা দাহিরের দরবারে: “বন্দিদের মুক্ত করো, জলদস্যুদের শাস্তি দাও, নইলে এ অন্যায়ের হিসাব আমরা নেব।”
দাহিরের উত্তর ছিল আশ্চর্যরকম ঠান্ডা। কখনও বললেন, “ওরা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে,” কখনও কার্যত চোখ বন্ধ করে বসে থাকলেন। একদিকে নিজের বন্দর থেকে অন্য ধর্মের বিধবা ও শিশু অপহৃত হচ্ছে, অন্যদিকে রাজা বলছেন, “আমার কিছু করার নেই”—এটা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা না; এটা ছিল নৈতিক দেউলিয়াত্ব।
হজ্জাজের হাতে ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।
“যে শাসক নিজের ভূখণ্ডে জলদস্যুকে আশ্রয় দেয়, বন্দি নারীদের ফিরিয়ে দিতে পারে না, তাকে সামান্য এক চিঠিতে বোঝানো যাবে না”—এই যুক্তি নিয়ে তিনি খেলাফতের কাছে অভিযানের অনুমতি চান।
সিন্ধু বিজয়ের আগুনের প্রথম কাঠি আসলে রাজা দাহিরই জ্বাললেন; আরব তরবারি শুধু সেই আগুনকে দিকনির্দেশ দিল।
অনেক ইতিহাসবিদ তাকে “শেষ হিন্দু রাজা” হিসেবে স্মরণ করেন, সেটা আলাদা কথা।
কিন্ত যে রাজা নিজের বন্দরে আটকে পড়া এতিম আর বিধবার জন্যও ন্যায় আনতে পারেন না, তার বৈধ শাসন নিয়ে যে প্রশ্ন উঠবে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।
তরুণ মুহাম্মদ বিন কাসিম
তায়েফের সাকিফ গোত্রের ছেলে মুহাম্মদ। অল্পবয়সে বাবা মারা যান, মা তাকে মানুষ করেন।কিন্তু রাজনৈতিক অভিভাবক হিসেবে পাশে ছিলেন হজ্জাজ নিজে।
শৈশব থেকেই সামরিক শৃঙ্খলা, অস্ত্রের ব্যবহার, কৌশল, প্রশাসন—সব শেখানো হয়েছে তাকে। পারস্য অঞ্চলে বিদ্রোহ দমন করে তিনি নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেন। তারপরই আসে বড় ডাক—সিন্ধু অভিযানের সর্বাধিনায়ক।
বয়স তখন সতেরো–আঠারো।
একটু ভেবে দেখুন—আমাদের দেশের গড় সতেরো বছরের ছেলেটা তখন কলেজে ভর্তি কবে হবে সেটা ভাবছে; ওই ছেলেটি ভাবছে কীভাবে একটি সীমান্ত রাজ্য দখল করে শাসন করবে।
দেবল থেকে মুলতান
৭১১–৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিম সেনাবাহিনী নিয়ে মাকরান অতিক্রম করে সিন্ধুতে প্রবেশ করেন। প্রথম আক্রমণের লক্ষ্য ছিল সমুদ্রবন্দর শহর দেবল। কাসিম শহর ঘেরাও করে সীজ–ইঞ্জিন ব্যবহার করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘অল‑উরূস’। প্রাচীর ভাঙে, প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে, শহর মুসলিম বাহিনীর হাতে আসে।
দেবলে পতাকা বদলায়, শাসকের নাম বদলায়।
এরপর ধারাবাহিকভাবে নীরুন, আরোড়, ব্রাহ্মণাবাদ—এক এক করে শহরগুলো দখল হয় বা শান্তির চুক্তিতে মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। ইন্দুস নদীর তীরে বড় যুদ্ধে রাজা দাহির নিহত হলে কেন্দ্রীয় প্রতিরোধের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। কয়েক বছরের মধ্যে সিন্ধু থেকে মুলতান পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল উমাইয়া খেলাফতের অংশ হয়ে যায়। ইতিহাসে এই আরব শাসিত সিন্ধু পরিচিত হয় “আরব সিন্ধু” নামে—উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের প্রথম স্থায়ী প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে।
“ইসলামের দরজা” কেন বলা হয়?
সিন্ধু বিজয়ের পরে উপমহাদেশে মুসলিম উপস্থিতি আর শুধু বণিক বা ভ্রমণকারীর পরিচয়ে নয়; এই বিজয়ের মাধ্যমে ভারতে মুসলিমদের একটি বাস্তব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা লাভ হয়।
পরবর্তীকালের গজনবী, গোরী, দিল্লি সালতানাত কিংবা খোদ মোগলদের কথা একবার ভাবুন।
আরব হোক, তুর্কি বা আফগান—পরের দিকের এই শাসকেরা একটা বড় মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা পেয়েছিলেন। তারা অন্তত এটুকু নিশ্চিত জানতেন যে, এই বিশাল ভূখণ্ডে এসে শাসনভার হাতে নেওয়াটা মোটেও কোনো অলীক কল্পনা নয়। কারণ, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকার মতো সেই প্রথম সফল দৃষ্টান্তটা কাসিমই রেখে গিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, এই বিজয়ের পর ইন্দুস উপত্যকা সরাসরি ইসলামী জগতের নেটে চলে যায়।আরবদের ব্যাবসা বাণিজ্য বাড়ে, আরবী–ফারসী ভাষার বিস্তার লাভ করে, বই, প্রযুক্তি, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা—প্রভৃতি বিজ্ঞান সব ধীরে ধীরে এ অঞ্চলে ঢুকতে থাকে।
আমরা যাকে পরে ইন্দো–ইসলামী সভ্যতা বলি, তার একটা বড় অংশ এ সময়েই রচিত হয়।
বিজেতা থেকে শাসক: কাসিমের প্রশাসনিক নীতি
এখানেই মুহাম্মদ বিন কাসিমকে একটু আলাদা করে দেখা দরকার। কারণ অনেক বিজেতা শুধু লুট করে চলে যায়। কাসিম সেটা করেননি।
যুদ্ধের মাঠে তিনি কঠোর ছিলেন, কিন্তু যুদ্ধ শেষ হলে তিনি বুঝলেন—দীর্ঘদিন শাসন করতে চাইলে পুরোনো কাঠামো পুরো ভেঙে ফেললে চলবে না। তাই তিনি বেশিরভাগ স্থানীয় রাজস্ব–কর্মী, হিন্দু ও বৌদ্ধ আমলাদের পদে রেখে দেন। গ্রাম–জমি–কর আদায়, পানির ব্যবস্থা, বাজার—সব প্রায় আগের মতোই চলে।
শুধু মাথার উপর নতুন কর্তৃত্ব: উমাইয়া খেলাফত।
কর ব্যবস্থায় সামান্য পরিবর্তন আসে; ইসলামী রাজস্ব নীতির সাথে মিলিয়ে কিছু হার পাল্টায়।
কিন্তু গ্রামটা যে গ্রামই ছিল, তা রাতারাতি সেনা–শিবির হয়ে যায় না।
ধর্মীয় নীতি: জিজিয়া আর সুরক্ষা
ধর্মের ব্যাপারে কাসিমের নীতি ছিল সোজা সাপ্টা, কিন্তু বেশ আধুনিক। যুদ্ধের আগুন শান্ত হলে নতুন একটা হিসেব কষতে হয়—কীভাবে সবাই এক ছাদের নিচে বাঁচবে? কাসিম তখন একটি পুরনো, পরীক্ষিত মডেল বেছে নিলেন—সুরক্ষিত প্রজার মডেল। অমুসলিমদের বলা হল: তোমরা নির্দিষ্ট একটা কর বা জিজিয়া দাও। ব্যস, এরপর আর কোনো ঝামেলা নেই। এই করের বিনিময়ে তোমাদের জীবন, তোমাদের জমি, তোমাদের ধর্মের আচার–অনুষ্ঠান—সব রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় থাকবে।
মন্দির, বৌদ্ধ বিহার, আশ্রম—যুদ্ধের ডামাডোলে যেখানে যা ক্ষতি হয়েছিল, শান্তি ফেরার পর তা মেরামত করার অনুমতি দেওয়া হল। পূজা–অর্চনা, উৎসব আগের মতোই চলল।
ব্রাহ্মণাবাদের মতো পুরোনো কেন্দ্রে মন্দিরের ঘণ্টা থামানো হয়নি; ঘণ্টা বেজেছে ঠিকই, শুধু তার ওপরে নতুন শাসকের সিলমোহর লেগেছে।
আইন–কানুনের বেলাতেও কাসিম বুঝলেন, সবাইকে এক মাপে বাঁধলে দড়ি ছিঁড়ে যাবে।
তাই, মুসলমানদের বিচার হতে থাকল শরিয়াহ আইনে। আর হিন্দুদের বিয়ে, তালাক, সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা—সেসব চলতে থাকল তাদের নিজেদের পুরনো রীতি ও ধর্মীয় আইন অনুযায়ী।
মজার ব্যাপার হলো— নতুন রাজা, নতুন রাজধানী, নতুন ভাষা, কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে একজন সাধারণ কৃষক বা কারিগর হঠাৎ আবিষ্কার করলেন না যে, তার জীবন রাতারাতি ওলটপালট হয়ে গেছে। মাথার ওপর শাসন বদলেছে ঠিকই, কিন্তু পাড়ার পঞ্চায়েত আর ঘরের দেবতা যেখানে ছিল, সেখানেই রয়ে গেছে।
স্থানীয় সমাজের চোখে কাসিম
‘চাচনামা’ এবং প্রাচীন আরবী ইতিহাসবিদ বালাযুরির ‘ফুতুহ আল–বুলদান’ ঘাঁটলে আমরা এক অদ্ভুত চিত্র পাই। সেখানে দেখা যায়, সমাজের নিচের তলার মানুষ, বিশেষ করে বৌদ্ধ এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের একটা বড় অংশ কাসিমের শাসনকে কিছুটা হাঁফ ছাড়ার সুযোগ হিসেবে দেখেছিল। কারণ, ব্রাহ্মণ–কেন্দ্রিক আগের যে কড়া সমাজ–কাঠামো আর চাপ ছিল, আরব শাসনে এসে সেই দড়িটা অনেকটাই আলগা হয়ে যায়।
একটা ব্যাপার পরিষ্কার: কাসিম এই নতুন ভূখণ্ডে এসে চারপাশের সবাইকে ‘শত্রু’ বানিয়ে রাজত্ব করতে চাননি। তিনি অনেককেই নিজের অংশীদার করেছেন, দাহিরের মতো বিরোধী পক্ষের আত্মীয়দেরও প্রশাসনে জায়গা দিয়েছেন।
তার এই শাসনপদ্ধতি কতখানি সফল আর মানবিক ছিল, তার একটা চমৎকার প্রমাণ মেলে বালাযুরির লেখায়। তিনি কাসিমের অকাল মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন—
“হিন্দের মানুষ মুহাম্মদ বিন কাসিমের জন্য কেঁদেছিল, আর কিরাজ শহরের লোকেরা তো তার মূর্তি বানিয়ে রেখেছিল।” এক বিদেশি সামরিক নেতার জন্য বিজিত দেশের মানুষের এই চোখের জল আর ভালোবাসা প্রমাণ করে যে, তরবারির চেয়ে সুবিচার দিয়ে তিনি অনেক বেশি হৃদয় জয় করেছিলেন।
ট্র্যাজেডি: এত বিজয়, এমন পরিণতি
দুঃখের বিষয় সিন্ধু জয় করেও মুহাম্মদ বিন কাসিমের নিজের জীবন খুব সুখের ছিল না। উমাইয়া খেলাফতে ক্ষমতা পাল্টাল, হজ্জাজ মারা গেলেন, নতুন খলিফা সুলায়মান এলে পুরনো হজ্জাজ–ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে রাজনীতি শুরু হল। এই নতুন পালা–বদলে সিন্ধুর সফল বিজেতা হঠাৎই “ভুল মানুষ” হয়ে যান। তাকে তড়িঘড়ি করে দামেস্কে ফিরিয়ে আনার আদেশ জারি হয়। ফেরার পথে বা গিয়ে তিনি বন্দি হন, নির্যাতিত হন, অল্প বয়সেই মৃত্যুবরণ করেন—বেশিরভাগ সূত্র এটাই বলে।
একটা অদ্ভুত দৃশ্য কল্পনা করা যায়: যে ছেলেটা কয়েক বছর আগে এক দেশের মানচিত্র পাল্টে দিয়েছে, সেই একই ছেলেকে এখন একটি অন্ধকার সেলে বসিয়ে রাখা হয়েছে; কারও মুখে তার নাম নেই, শুধু কিছু কাগজে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ।
তবু প্রভাব থেকে যায়
অনেক সময় রাজদরবারের ক্ষমতার রদবদল বা ব্যক্তির মর্মান্তিক মৃত্যু মাটির মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছন্দকে পুরোপুরি মুছে দিতে পারে না। মুহাম্মদ বিন কাসিমের বেলাতেও ঠিক তা-ই ঘটেছিল। দামেস্কে ক্ষমতার রাজনীতি তাকে ফাঁদে ফেলেছিল ঠিকই, কিন্তু সিন্ধুতে তার তৈরি করে যাওয়া আরব শাসন তার সাথেই কবরস্থ হয়ে যায়নি।
তিনি যে প্রশাসন, কর-ব্যবস্থা, বন্দর-নগরী আর সামাজিক প্যাক্ট তৈরি করে গিয়েছিলেন, তা নানা বাঁক পেরিয়েও দীর্ঘদিন টিকে ছিল। প্রায় দু’শ বছর ধরে সিন্ধু আব্বাসীয় খেলাফতের অংশ হিসেবে কাজ করেছে। সে সময়ে সিন্ধি ভাষায় নসখ লিপির ব্যবহার শুরু হয়, কৃষি ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটে, এবং মনসুরার মতো নগরী গড়ে ওঠে।
আরও বড় কথা হলো, কাসিম যে শাসন-মডেল দাঁড় করিয়েছিলেন—অমুসলিমদের সুরক্ষিত প্রজা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং স্থানীয় আমলাদের প্রশাসনে বহাল রাখা—সেটাই হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের একটা অলিখিত সংবিধান।
পরবর্তী শতকের বহু মুসলিম শাসক, সে আরব হোক, তুর্কি বা আফগান, যখনই উপমহাদেশের কোনো নতুন ভূখণ্ডে শাসন করতে গেছেন, তারা আসলে কমবেশি কাসিমের সেই দেখানো পথেই হেঁটেছেন। কাসিম দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, তরবারি দিয়ে রাজ্য জেতা গেলেও, রাজ্য শাসন করতে হয় স্থানীয় মানুষের সাথে আপস করে, তাদের ধর্ম ও রীতিনীতিকে একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে মেনে নিয়ে।
এ কারণেই কাসিম শুধু একজন সামরিক বিজেতা নন; তিনি সেই ভিত্তিপ্রস্তর, যার ওপর দাঁড়িয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইন্দো-ইসলামী সভ্যতার এক বিশাল ইমারত গড়ে উঠেছিল।
আমাদের জন্য শিক্ষা
মুহাম্মদ বিন কাসিমের জীবনের দিকে তাকালে খুব সোজা কয়েকটা বিষয় উঠে আসে।
এক. নেতৃত্ব মানে শুধু তরবারি চালানো আর দুর্গ দখলের গল্প নয়; আসল গল্পটা শুরু হয় জয়ের পর। কাসিম দেখিয়েছেন, যুদ্ধ শেষে দেশ চালাতে গেলে পুরোনো কাঠামো এক ধাক্কায় ভেঙে চুরমার করে দিলে চলে না। বুদ্ধিমানের কাজ হলো, সেই পুরোনো ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই নিজের নতুন ইমারতটা গড়ে তোলা।
দুই. ভিন্ন ধর্ম আর ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে একই দেশে সহাবস্থান তৈরি করা অসম্ভব কিছু নয়। তবে তার জন্য ফাঁকা বুলি বা শুধু মিষ্টি কথায় চিঁড়ে ভেজে না; দরকার স্পষ্ট নিয়ম, আইনি সুরক্ষা এবং এক ধরনের ন্যায্যতা। তিনি স্থানীয়দের যে আইনি ও ধর্মীয় অধিকার দিয়েছিলেন, তা সে যুগের হিসেবে ছিল যথেষ্ট বাস্তববাদী।
তিন. ইতিহাসের চরিত্রদের আমরা খুব সহজেই হয় দেবতার আসনে বসাই, নয়তো খলনায়ক বানিয়ে দিই। কিন্তু একটু পরিণত চোখে তাকালে বোঝা যায়, রক্তমাংসের মানুষ মাত্রই বহুমাত্রিক। তার চমকপ্রদ সাফল্য যেমন আছে, তেমনি সময়ের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা আর ভুলও আছে।
মুহাম্মদ বিন কাসিমকে যদি আমরা শুধু আজকের হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক তর্কের একটা খুঁটি বানিয়ে রাখি, তাহলে আসলে আমরা তাকে ভীষণ ছোট করে ফেলি। বরং তাকে দেখা উচিত এমন এক তরুণ হিসেবে—যে সাহস, শৃঙ্খলা, রাষ্ট্রবোধ আর এক ধরনের বাস্তববাদী সহনশীলতা নিয়ে সিন্ধুর মাটিতে দাঁড়িয়ে পুরো উপমহাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন।