পণ্ডিতেরা বলেন, জগতটা বড় বিচিত্র। কেউ এখানে ল্যাবরেটরির টেস্ট টিউবে স্রষ্টাকে খুঁজতে যান, আবার কেউ নক্ষত্র গুনতে গুনতে মহাকাশে হারিয়ে যান। কিন্তু দিনের শেষে সেই পুরনো প্রশ্নটা থেকেই যায়—সবই যদি অণু-পরমাণুর ধাক্কাধাক্কি হয়, তবে মানুষের এই অবচেতন মনটা কেন বারবার একজন ‘সৃষ্টিকর্তা’র জন্য হাহাকার করে ওঠে? এটা কি স্রেফ দাদামশায়ের আমলের সংস্কার, নাকি আমাদের কলিজার ভেতরে গেঁথে দেওয়া কোনো চিরন্তন সত্য?
আসলে মানুষ কেন বিশ্বাস করে, তার তল খুঁজতে গেলে আমাদের অন্তত কয়েকটা ঘাটে নৌকা ভিড়াতে হবে।
১. ফিতরাত: আমাদের মজ্জাগত সেই পুরনো নেশা
প্রথম যুক্তিটা কোনো কেতাবি লজিক নয়, বরং অনেকটা আমাদের সৈয়দ মুজতবা আলী সাহেবের ভাষায় বলতে গেলে—পেটের ক্ষিধের মতোই স্বাভাবিক। আলী সাহেব হয়তো বলতেন, “মিশরের কায়রোতে যান কিংবা প্যারিসের ক্যাফেতে—মানুষের খাসলত বদলায় না।”
আমরা যেমন আমাদের নিজেদের ভালোবাসতে শিখি না, কিংবা সন্তানের প্রতি মায়ার জন্য কোনো টিউটোরিয়াল লাগে না; ঠিক তেমনি স্রষ্টার প্রতি এই টানটাও আমাদের অস্তিত্বের মজ্জায় মিশে আছে। দর্শনের ভাষায় একে বলে ‘ফিতরাত’। আপনি যুক্তির চাদর দিয়ে একে ধামাচাপা দিতে পারেন, কসম খেয়ে নাস্তিক হতে পারেন, কিন্তু ঘোর সংকটে পড়লে ওই অবচেতন মনটা ঠিকই এক অলৌকিক আশ্রয়ের দিকে হাত বাড়ায়। ফরাসি পারফিউম দিয়ে যেমন গায়ের আসল গন্ধ মোছা যায় না, তেমনি যুক্তি দিয়ে হৃদয়ের এই আদিম তৃষ্ণাকে মেটানো দায়।
২. সৃষ্টির নকশা: দুর্ঘটনা নাকি নিপুণ কারিগরি?
দ্বিতীয় যুক্তিটা চশমাধারী বিজ্ঞানীদের জন্য। একে বলা হয় ‘টেলিওলজিক্যাল আর্গুমেন্ট’ বা উদ্দেশ্যমূলক যুক্তি। আমরা যখন আমাদের দেহের কোষ থেকে শুরু করে আসমানের নক্ষত্রপুঞ্জ দেখি, তখন মনে হয় যেন এক বিশাল লাইব্রেরিতে ঢুকে পড়েছি। আপনি কি বিশ্বাস করবেন যে, এক গাদা ছাপার অক্ষর হঠাৎ বাতাসে উড়ে এসে নিজে নিজেই ‘আবদুর রহমান’ স্টল থেকে একখানা ‘চাচাকাহিনী’ হয়ে বের হয়ে এলো? অসম্ভব!
ঠিক তেমনি, মহাবিশ্বের এই সূক্ষ্ম শৃঙ্খলা আর জ্যামিতিক নিখুঁত বিন্যাস স্রেফ কোনো ‘বিগ ব্যাং’-এর ধাক্কায় অন্ধভাবে তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। বিজ্ঞান যত এগোচ্ছে, আধুনিক মানুষ ততই দেখছে যে প্রতিটা ডিএনএ (DNA)-এর ভাঁজে ভাঁজে একজন মহাজাগতিক শিল্পীর স্বাক্ষর জ্বলজ্বল করছে। অর্থাৎ, বিজ্ঞান এখানে আড়াল নয়, বরং স্রষ্টাকে দেখার একখানা ঝকঝকে আয়না মাত্র।
৩. যুক্তির সীমানা ও মরমিয়া তৃষ্ণা (The Limits of Reason)
এখানে একটি নতুন কথা যোগ করা দরকার। যুক্তি আমাদের স্রষ্টার দুয়ার পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সেই ঘরের ভেতরে বসিয়ে ভালোবাসা শেখাতে পারে না। গ্রিক দর্শনের ‘এথেন্স’ আর বিশ্বাসের ‘জেরুজালেম’—এই দুইয়ের মাঝে একটি বড় পার্থক্য আছে। যুক্তি হলো ম্যাপের মতো, কিন্তু বিশ্বাস হলো গন্তব্যে পৌঁছানোর তৃষ্ণা।
মুজতবা আলী সাহেবের সেই বিখ্যাত উক্তিটা মনে পড়ে? “বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না।” তেমনি বলব, যুক্তি দিয়ে কেউ কখনো পূর্ণ সত্য পায় না। যুক্তি আমাদের বলে—একজন ‘কারিকর’ আছেন। কিন্তু সেই কারিকর কি আমাদের ওপর রাগ করে আছেন নাকি ভালোবেসে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন, তা জানার জন্য বুদ্ধির বাইরেও একটা ‘দিব্যদৃষ্টি’ বা ওহীর প্রয়োজন হয়।
৪. গোলমালটা তবে কোথায়?
এখান থেকেই সব প্যাঁচ লাগে। প্রশ্ন উঠতে পারে—সবাই যদি স্রষ্টায় বিশ্বাস করে, তবে এত মারামারি আর কাটাকাটি কেন? আলী সাহেবের ভাষায় বললে বলতে হয়, “সবাই রসগোল্লা খেতে চায় ঠিকই, কিন্তু কেউ চায় সেটা চিনির রসে হোক, কেউ চায় নলেন গুড়ের।”
মানুষের আদিম লড়াইটা কিন্তু স্রষ্টার ‘অস্তিত্ব’ নিয়ে নয়; লড়াইটা তাঁর ‘পরিচয়’ আর তাঁকে ‘ডাকার পদ্ধতি’ নিয়ে। স্রষ্টা আছেন—এ কথা বিবেক আর প্রকৃতি সজোরেই জানান দেয়। কিন্তু সমস্যাটা হয় তখন, যখন মানুষ সেই পরম সত্তাকে নিজের সীমিত কল্পনা আর অনুমানের ফ্রেম দিয়ে মাপতে যায়। ওখানেই জন্ম নেয় বিভ্রান্তি।
৫. রত্নগর্ভা পৃথিবী বনাম শূন্য হৃদয়
আমরা আজকের দিনে তথ্যের জঞ্জালে ডুবে আছি, কিন্তু জ্ঞানের পিপাসায় ছটফট করছি। আমাদের হাতে স্মার্টফোন আছে কিন্তু শান্তি নেই। এর কারণ কী? কারণ আমরা সৃষ্টির সরঞ্জাম নিয়ে এত বেশি মশগুল হয়ে পড়েছি যে স্রষ্টার কথা ভাবার ফুরসতটুকুও হারিয়ে ফেলেছি। জীবনটা যেন একটা বড়সড় মেলা, যেখানে আমরা খেলনা দেখে এতই মুগ্ধ হয়েছি যে মেলার আয়োজকের কথা ভুলেই গেছি।
উপসংহার: দুয়ার আর ঘরের চাবিকাঠি
বিবেক আর আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি আমাদের স্রষ্টার সদর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দেয় ঠিকই। কিন্তু ঘরের ভেতরে প্রবেশের জন্য প্রয়োজন সঠিক পথ আর নির্ভরযোগ্য চাবিকাঠি। বুদ্ধিকে আমরা কি কেবল ডাল-ভাতের তর্ক করার জন্যই খরচ করব, নাকি সৃষ্টির নিগূঢ় রহস্য ভেদ করে সেই ধ্রুব সত্যকে স্পর্শ করব?
নিজে নিজেই তো অনেক চড়কিপাক খেলাম, এবার না হয় সেই মহান কারিগরের বাতলে দেওয়া নির্ভেজাল পথের দিকেই একটু ফিরে তাকানো যাক। কী বলেন?